মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত: উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ও নাবিকদের আশ্রয় দিল ভারত
ভারত মহাসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাতের কারণে এক উত্তপ্ত রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই এক বিরল মানবিক ও কূটনৈতিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে ভারত। প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ও জীবননাশের আশঙ্কায় থাকা একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ এবং এর ১৮৩ জন নাবিককে নিজেদের বন্দরে আশ্রয় দিয়ে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে মোদি সরকার। শনিবার (৭ মার্চ) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে যে ইরানের ‘আইআরআইএস লাভান’ নামক একটি বৃহৎ ল্যান্ডিং জাহাজকে কেরলের কোচি বন্দরে জরুরি ভিত্তিতে ডকিং বা নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত এই ইরানি জাহাজটি আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়ে একটি জরুরি বিপদ সংকেত বা ডিস্ট্রেস কল পাঠায়। কাকতালীয়ভাবে ওই একই দিনে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ১ মার্চ জাহাজটিকে বন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় এবং কয়েক দিনের পথ পাড়ি দিয়ে গত ৪ মার্চ এটি কোচি বন্দরে এসে পৌঁছায়। বর্তমানে জাহাজটির ১৮৩ জন নাবিক ও ক্রু সদস্যকে ভারতীয় নৌবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে কোচির নৌ-স্থাপনায় নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন মাত্র কয়েক দিন আগে শ্রীলঙ্কা উপকূলে ‘আইআরআইএস ডেনা’ নামক অপর একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ মার্কিন সাবমেরিনের টরপেডো হামলায় বিধ্বস্ত হয়। উল্লেখ্য যে ভারত আয়োজিত বহুপাক্ষিক নৌ-মহড়া ‘মিলান-২০২৬’ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউতে অংশ নিয়ে ফেরার পথে ইরানি ওই জাহাজটি আক্রান্ত হয়েছিল যাতে ৮০ জনেরও বেশি নাবিক নিহত হন। সেই ঘটনায় ভারতের নীরবতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা সমালোচনা হলেও ‘আইআরআইএস লাভান’ জাহাজটিকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে ভারত এটিই প্রমাণ করল যে যুদ্ধ বিগ্রহের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক জীবন রক্ষা এবং সমুদ্র আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই তাদের অগ্রাধিকার।
সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মাঝে যখন অস্ত্রের গর্জন আর বারুদের গন্ধে আকাশ ভারি হয়ে ওঠে তখন মানুষের জীবন হয়ে পড়ে সবচেয়ে সস্তা। কিন্তু বৈরিতার এই ঘোর অমানিশায় ভারতের এই মানবিক পদক্ষেপটি যেন শান্তির এক ঝলক স্নিগ্ধ আলো যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সীমানার বিভেদ ছাপিয়ে মানবতা আজও বেঁচে আছে। সাগরের দিগন্তরেখায় যখন একটি বিপদগ্রস্ত জাহাজ আশ্রয়ের প্রার্থনা করে তখন তাকে ফেরানো কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয় বরং তা বিবেকের লড়াই। যুদ্ধের এই অন্ধকার মেঘ একদিন কেটে যাবে কিন্তু বিপদের দিনে বাড়ানো এই সহমর্মিতার হাতটি ইতিহাসের পাতায় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে অক্ষয় হয়ে থাকবে কারণ দিনশেষে প্রতিটি জীবনই মূল্যবান এবং ভালোবাসার আশ্রয়েই গড়ে ওঠে এক নিরাপদ পৃথিবী।