হরমুজ প্রণালির উভয় পাশে আটকা পড়েছে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দ্বিতীয় দিনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ২ মার্চ সোমবার প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কৌশলগত এই জলপথের দুই পাশে অন্তত ১৫০টি বিশালকার ট্যাংকার ও পণ্যবাহী জাহাজ বর্তমানে আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজ অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহন করছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) থেকে ‘কোনো জাহাজ পার হতে দেওয়া হবে না’ মর্মে সতর্কবার্তা প্রচারের পর এই নজিরবিহীন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিক এবং রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ১০০টি কন্টেইনার জাহাজ, ৪৫০টি তেল-গ্যাস ট্যাংকার এবং ২০০টি বাল্ক ক্যারিয়ার বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ভেতরে ও আশপাশে অবস্থান করছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ইরাক, সৌদি আরব ও কুয়েত উপকূলের কাছাকাছি খোলা সমুদ্রে নোঙর করে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। অন্যদিকে, বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতারের উপকূলের কাছেও অনেকগুলো গ্যাসবাহী জাহাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক জাহাজ মাঝপথ থেকেই যাত্রা বাতিল করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বা ওমানের নিরাপদ জলসীমার দিকে ফিরে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। জার্মান শিপিং জায়ান্ট হ্যাপাগ-লয়েড এবং ডেনমার্কের মেয়ারস্ক লাইন ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তাদের সকল জাহাজ চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। ফরাসি গ্রুপ সিএমএ সিজিএম তাদের জাহাজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্বের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ থেকে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করবে।
সমুদ্রের এই বিস্তীর্ণ জলরাশি যখন যুদ্ধের দামামায় রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন তার প্রভাব প্রতিটি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গিয়ে পড়ে। শত শত জাহাজের এই নিশ্চল অবস্থান কেবল পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় না, বরং এটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির অশনি সংকেত। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপে এই নৌপথ আবারও নিরাপদ হয়ে উঠবে এবং মানবিক বিপর্যয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিটি নাবিক ও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্যের চাকা সচল রাখা এবং শান্তি ফিরিয়ে আনাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান অঙ্গীকার। সংঘাতের অন্ধকার কাটিয়ে পৃথিবী আবারও সম্প্রীতির আলোয় আলোকিত হোক এটিই আজ সবার প্রার্থনা।