অবশেষে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষর করল এনসিপি; যমুনায় পূর্ণতা পেল জাতীয় ঐকমত্য
দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবং নিজেদের উত্থাপিত তিন দফা দাবির প্রেক্ষিতে অবশেষে ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষর করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে দলটির পক্ষ থেকে এই সনদে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করা হয়। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এর মাধ্যমে গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াটি পূর্ণতা পেল বলে মনে করা হচ্ছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অধীনে প্রণীত এই সনদে গত বছরের ১৭ অক্টোবর ২৫টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করলেও এনসিপি তখন আইনি ভিত্তি ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে সই করা থেকে বিরত ছিল। এনসিপির পক্ষ থেকে মূলত তিনটি প্রধান দাবি তোলা হয়েছিল: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া আগে প্রকাশ ও প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক তা জারি করা, গণভোটে জনগণের রায় পাওয়ার পর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের কার্যকারিতা বাতিল হওয়া এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী আগামী সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংস্কার করে ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’ নামকরণ করা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার এই সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেওয়ায় এনসিপি এখন এই প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে শামিল হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এনসিপিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন যে এই তরুণ প্রজন্মের দলটি সনদে স্বাক্ষর করায় জুলাই জাতীয় সনদ এখন সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন ছাত্র-জনতা দেখেছিল, এই সনদ হবে তার রক্ষাকবচ। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম জানান যে যদিও তাঁরা সবার শেষে স্বাক্ষর করেছেন, তবে শুরু থেকেই তাঁরা এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন। জনগণের আস্থার মর্যাদা রক্ষায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁরা আগামীকাল মঙ্গলবার দ্বিগুণ শপথ গ্রহণ করবেন বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রণীত এই সনদে এখন পর্যন্ত দেশের প্রধান সব রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডাররা একমত হয়েছেন। এই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টিই সংবিধান সংক্রান্ত যা আগামী সংসদ কর্তৃক বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জাতীয় ঐক্যের এই নতুন সেতুবন্ধন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন ইতিহাসের পাতায় এই সনদের কথা পড়বে তখন তারা জানবে যে একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি রচিত হয়েছিল সংঘাতের বদলে সংহতির মাধ্যমে। আমরা বিশ্বাস করি এই সনদের প্রতিটি অক্ষর যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি নাগরিকের জীবনে সুফল বয়ে আনে এবং একটি সুন্দর ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে থাকে।